ব্লাসফেমি আইন বনাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

মানুষের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার খুব সম্ভব মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এ মুহূর্তে বাংলাদেশে এ নাগরিক অধিকারটি হুমকির সম্মুখীন। হেফাজতে ইসলাম কঠোর ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবি জানাচ্ছে এবং সরকার মুক্তমতের পক্ষে না থেকে একটি হীন আপোষের নীতি গ্রহণ করেছে, ফলে মিডিয়া সাধারণের তথ্যঅধিকার প্রদানে বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন বা হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন এমন তরুণ ব্লগারদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে; ধ্বংসের আশঙ্কার মুখে পড়েছে দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যতটাও।

free-speech

বাকস্বাধীনতা কেন গুরুত্বপূর্ণ? উনিশ শতকের ব্রিটেনের বিখ্যাত ও প্রভাবশালী ‘ফিলোসপার অব ফ্রিডম’ জন স্টুয়ার্ট মিলের কাছে বিশ্বের প্রায় সব জাতিকেই কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকতে হবে, তাঁর ভাষায়, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ সত্যান্বেষণের প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে।

প্রথমত, কোনো মানুষই ত্রুটিমুক্ত নয়। হেফাজতে ইসলামও নয়, সরকারও নয়, আমিও নই। কেউ পরম সত্যের সন্ধান পাওয়ার দাবি করতে পারে না। বিভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠী প্রায়ই এমনতর দাবি করে থাকে, অবশ্যই এটি একটি সমস্যা, এ দাবিটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রথম যুগের ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষকদের লেখার মনগড়া ও চরম অবাস্তব ব্যাখ্যার ভিত্তিতে। কিন্তু আমরা জানি যে কথাগুলো আমরা এখন প্রকাশ হতে দিচ্ছি না- হয়তো সেগুলোর মধ্যেই সত্য লুকানো রয়েছে!

দ্বিতীয়ত, মিলের মতে, যদিও-বা অপ্রকাশিত বক্তব্য ভুল হয়ে থাকে- ‘এই বক্তব্যগুলো সাধারণত সত্যের কোনো না কোনো অংশ ধারণ করে; এবং প্রচলিত এবং জনপ্রিয় ধারণাগুলো প্রায় সবসময়ই আংশিক সত্য হয়, কাজেই, শুধুমাত্র এসব প্রচলিত ধারণার বিরোধী বিভিন্ন মতামতের প্রকাশের মধ্য দিয়েই সত্যের কাছাকাছি যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়।’

তাছাড়া, সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ধারণাগুলোরও সংরক্ষণ এবং প্রকাশ প্রয়োজন- কারণ সত্য শুধুমাত্র সন্দেহ, প্রশ্ন এবং বিরোধী মতবাদের সাথেল ড়াই করেই টিকে থাকে। এ লড়াই থেমে গেলে সত্য পরিণত হয় রক্ষণশীল সামাজিক শৃংখলে।

মানুষের জীবনে সত্যের সন্ধান এবং বাকস্বাধীনতার গুরুত্ব অপরিসীম। মানবজন্মের সার্থকতা নিজের পছন্দমত জীবনযাপনের মধ্যে; অন্যের নির্ধারণ করে দেয়া গন্ডীর মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে নয়। জীবনের সার্থকতা পেতে হলে মানুষকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়ার সুযোগ করে পেতে হবে, যার জন্য প্রয়োজন মতামত এবং দর্শনের মুক্তপ্রকাশের নিশ্চয়তা। এ কারণেই মানুষ সবসময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতা চায়। এই স্বাধীনতায় যে কোন হস্তক্ষেপ এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করে এবং মানবজীবনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্র এবং মানবীয় গুণাবলীর বিকাশের জন্যও খুবই জরুরী। বাংলাদেশকে এমন একটি দেশ হতে হবে- যে দেশে সব ধরনের মতবাদ প্রকাশিত হতে পারবে, হতে পারবে প্রশ্নবিদ্ধ। মতামত যারই হোক না কেন, সেই মতামতকে আমলে নিতে হবে এবং প্রচলিত ধ্যানধারণাগুলোকে বিরোধী মতবাদের সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হবে। তবেই কেবলমাত্র রাজনৈতিক এবং সামাজিক উন্নতি সম্ভব। মানবজাতি গত হাজার বছরে অনেকটুকু পথ হেঁটেছে। প্রতি মুহুর্তে প্রতিটি পরিবর্তন, প্রতিটি যুগান্তকারী দর্শন এবং মতবাদ হয়েছে প্রশ্নবিদ্ধ, সমালোচিত এবং এসব মতবাদের জনক যাঁরা- তাঁরা হয়েছেন নির্যাতিত। গ্যালিলিওর সাথে রোমান ক্যাথলিক চার্চ কীরকম আচরণ করেছিলো- সেটা সবারই জানা আছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর হস্তক্ষেপ স্বৈরাচারের লক্ষণ; এর স্থান সৌদী আরব কিংবা উত্তর কোরিয়ায়, স্বাধীন বাংলাদেশে নয়। গণতন্ত্রে প্রতিটি মতামতকে প্রকাশিত হতে দিতে হবে; প্রতিটি মতামত নিয়ে মুক্তমনে বিতর্ক হতে হবে। কাউকে কথা বলতে দিলে এবং কাউকে না দিলে- সেটা এক ধরণের নাগরিক বৈষম্য।

বাকস্বাধীনতা একটি মৌলিক অধিকার। Universal Declaration of Human Rights এর আর্টিকেল ১৯ অনুযায়ী, “[e]veryone has the right to freedom of opinion and expression; this right includes freedom to hold opinions without interference and to seek, receive and impart information and ideas through any media and regardless of frontiers.” অর্থাৎ, প্রত্যেক মানুষে র মতামত এবং অনুভূতি প্রকাশের অধিকার রয়েছে; এ অধিকারের মধ্যে রয়েছে বিনা বাধায় মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং কোনো তথ্য ও মতবাদ মাধ্যম এবং রাষ্ট্রনির্বিশেষে আদানপ্রদানের অধিকার।

কাজেই, কেউ যদি এই বাকস্বাধীনতাকে রহিত করতে চান, কোনো বিশেষ ধরনের বক্তব্যের গলা চেপে ধরতে চান- তাহলে তাঁদেরকে এর পক্ষে খুব জোরালো যুক্তি প্রদান করতে হবে। কিন্তু তাঁরা তা করেন না।

দেখা যাক- ব্লাসফেমী কী। ব্লাসফেমী হলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী পবিত্র মনে করে এমন কোনো ব্যক্তি বা বস্তুকে নিয়ে ব্যঙ্গ, অপমান বা তার সম্পর্কে বাজে কথা বলা। উদাহরণস্বরুপ, ইসলামিক দৃষ্টিভঙ্গীতে আল্লাহকে অপমান করা আল্লাহর ‘অধিকার- এর বরখেলাপ। কাজেই, একজন মুসলমানের কর্তব্য আল্লাহকে অপমান না করা। কিন্তু, সেটা অবিশ্বাসী বা নাস্তিকদের (নাস্তিক কিন্তু কোনো গালি নয়!) জন্য প্রযোজ্য নয়। কাজেই, একটি ‘সেকুলার রাষ্ট্রে ধর্মীয় চেতনা বা বিশ্বাসের ভিত্তিতে আইন প্রণয়নের কোনো সুযোগ নেই।

নাগরিকদেরকে ধর্মপালনে বাধ্য করা কিংবা নাগরিকদের উপর কোনো বিশেষ একটা ধর্ম চাপিয়ে দেয়া রাষ্ট্রের কাজ নয়। এখানে কেউ বলতে পারেন, যে ব্লাসফেমী নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন- ধার্মিক ব্যক্তিদের স্বার্থে, কারণ ব্লাসফেমী তাঁদের অনুভূতিকে আহত করে। এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি বটে। কাউকে মানসিকভাবে আহত করা অবশ্যই অনুচিত। একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব যদি হয় কারো শারীরিক নিরাপত্তা দেয়া, তাহলে রাষ্ট্র কেন তার নাগরিকদের ‘মানসিক’নিরাপত্তার দায়িত্ব নেবে না? তাহলে রাষ্ট্র কেন আক্রমণাত্মক এবং অপমানজনক বক্তব্য প্রদানকে নিষিদ্ধ করতে পারবে না?

কারণ, প্রথমত- সব ধরনের বক্তব্যই কারো না কারো অনুভূতিকে আহত করে। উদাহরণস্বরূপ, হিফাজতে ইসলামের একটি দাবী হলো- নারীদের সমঅধিকারের আইন বাতিল করতে হবে; এই দাবী অবশ্যই নারীদের সমঅধিকারে বিশ্বাসী জনগোষ্ঠীকে আহত করবে। ঠিক একইভাবে, তারা দাবী করে যে আহমদিয়া গোষ্ঠীকে অমুসলিম ঘোষণা করতে হবে- যেটা আহমদিয়া তরিকার অনুসারীদের জন্য অপমানজনক। গীর্জায় খ্রীষ্টান ধর্মযাজকের সার্মন মুসলমানের অনুভূতিকে আহত করতে পারে, কমিউনিস্টের বক্তব্য পুঁজিবাদীদের আহত করতে পারে, কেউ কেউ সমকামীদের নিয়ে লেখাপড়ে আহত হতে পারেন, কেউ কেউ আবার আমার অবাঙ্গালী হয়ে একজন বাঙালী নারীকে বিয়ে করাটাকে তাঁদের অনুভূতিতে আঘাত বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু আমরা বিশ্বাস করি- যদিও এসব কারো না কারো জন্য অস্বস্তিকর, এগুলোর নিরাপত্তা দেয়া রাষ্ট্রের কর্তব্য।

এছাড়াও, কোনো এক শ্রেণীর বক্তব্যকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ ঘোষণা করাটা যুক্তিযুক্ত নয়, কারণ মানুষ খুব সহজেই নিজেদেরকে এসব বক্তব্য শোনা বা পড়া থেকে দূরে রাখতে পারে। বাকস্বাধীনতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, এবং এটা রক্ষা করাটা জরুরী। তার পরিবর্তে আপনার অপছন্দনীয় বক্তব্যগুলো শোনা বা পড়া থেকে বিরত থাকাটা খুবই সহজ। কারো কথা শুনতে ভালো না লাগলে দূরেস রে যান। কারো ব্লগ পড়তে ভালো না লাগলে সেটা ক্লিক করে বন্ধ করে দিন। কোরান শরীফও একই কথা বলে: “যখন তারা [মুসলমানরা] খারাপ কথা শোনে, তারা সেখান থেকে সরে যায় এবং বলে, ‘আমার জন্য আমার কর্ম, এবং তোমার জন্য তোমার কর্ম। তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক; আমরা সত্যবিমুখদের সংসর্গে আসতে চাই না’।”২৮:৫৫

হিফাজতে ইসলামী এবং অন্যান্য কিছুই সলামিক দলের ধর্মীয় অনুভূতি যদি এতই ঠুনকো হয়ে থাকে, তাহলে তারা ওসব ব্লগ পড়ে কেন? যদি তারা চায়- যে কারো ধর্মীয় অনুভূতি আহত না হোক- তাহলে তারা সে সব ব্লগের লেখা অন্যদেরকে ডেকে এনে দেখায় কেন? সেসব লেখা কপি করে পত্রিকায় বা লিফলেটে ছাপায় কেন? এ যেন দৌড়ে এসে কারো সাথে ইচ্ছা করে ধাক্কা খাওয়া এবং তারপরতাকে আক্রমণকারী আখ্যা দিয়ে তার শাস্তি চাওয়া! এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ব্লাসফেমী সর্বপ্রকারে বন্ধ করা একেবারেই অসম্ভব, এবং এর চেষ্টা করতে যাওয়াটাও খুবই সময়সাপেক্ষ এবং জটিল। তা র চেয়ে এসব বক্তব্য শোনা থেকে বিরত থাকা খুবই সহজ। বিশেষ করে বাংলাদেশের মত দেশে- যেখানে অধিকাংশ লোক মুসলমান, এখানে কেউ প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য এমনিতেই দিতে পারে না।

অনেকে বলেন- ব্লাসফেমীর মূল সমস্যা হলো- এর ফলে গোলযোগ এবং অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টিহ তে পারে। আসলেই কি তাই? সবার অবশ্যই ‘ইনোসেন্স অফ মুসলিমস’এর কথা মনে আছে নিশ্চয়ই। এই নিম্নমানের ১৪ মিনিটের ভিডিওক্লিপটি জুলাই মাসে ইউটিউবে আপলোড করা হয়। কিন্তু এর পরবর্তী দু’মাস কিছুই ঘটেনি। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ব্লাসফেমী সরাসরি কোনো নৃশংসতা ছড়ায় না। এটা ছড়ায় সেসব মানুষের মাধ্যমে- যারা নৃশংসতা ছড়াতে চায়। এটা ছড়ায় সেসব মানুষের মাধ্যমে- যারাএ সবধ র্ম-অবমাননা কর জিনিসগুলো অন্যান্যদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। লক্ষ্য করুন- একটি মিশরীয় টেলিভিশনে খালিদ আবদাল্লাহ নামক একজন ব্যক্তি এই প্রসঙ্গে কথা বলার পরেই মূলত বিভিন্ন দেশে নৃশংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রমন য়। বহুবছর ধরে মানুষ ব্লগের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবগত ছিলো না। এতদিন পর্যন্ত এসব ব্লগ কাউকে আঘাত করেনি কিংবা অস্থিতিশীল পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করেনি। কাজেই, ধর্ম-অবমাননা সমস্যা না। সমস্যা হলো সেসব রাজনৈতিক সংগঠন যারা অসহিষ্ণু এবংযা রা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নৃশংসতা ছড়ানোর জন্য এসব ব্লগকে ব্যবহার করছে। তারা জোরপূর্বক বাংলাদেশ কে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে।

তাছাড়া এর কী নিশ্চয়তা আছে- যে আইন করলেই নৃশংসতা কমে যাবে? পাকিস্তানে তো ব্লাসফেমী আইন রয়েছে। এতে কি ওরা আমাদের থেকে ভালো আছে? এর চেয়ে আসুন- সবাইকে আমরা এটা বোঝানোর চেষ্টা করিযে- সংঘর্ষ, নৃশংসতা কোনো সমস্যার সমাধান নয়। কাউকে কথা বলতে না দেওয়া পরমতসহিষ্ণু তার বহিঃপ্রকাশ নয়, এবং এর ফলে সমাজে অসহিষ্ণুতা এবং অসন্তুষ্টি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে আসলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার পরিবর্তে আরও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

ব্লাসফেমি আইন সত্যের সন্ধানকে ব্যাহত করে, এটা মানুষের জন্য খারাপ, মানবসভ্যতার বিকাশের জন্য ক্ষতিকর। এটা অগণতান্ত্রিক এবং বাকস্বাধীনতা খর্ব করে। ইতিহাস বলে, এধরনের আইন সবসময়ই সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের জন্য এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য ব্যবহার করা হয় (আবারও আমরা এ র উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানের দিকে তাকাতে পারি)। এর ফলে কখনও সমাজে সহিষ্ণুতা এবং শান্তিরক্ষা হয় না, এবং এর দ্বারা ধার্মিকদের ধর্মানুভুতি রক্ষাও সম্ভবনয়।

অনুবাদ: অনীক ইকবাল

Advertisements