ইউটিউব নিষেধাজ্ঞা এবং অগ্রগতির সঠিক পথ

“ইন্নোসেন্স অভ মুসলিমস” মুভির ১৪ মিনিটের ট্রেইলারটি, যে মুভির অস্তিত্ব হয়ত আছে, হয়তবা নাই, ডাহা নির্বোধ এবং দুর্বলভাবে নির্মিত। মুসলিম হোক বা না হোক, বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন যে কারো কাছে এটা দেখা বেদনাদায়ক হবে। ইজিপ্সিয়ান বংশদ্ভুত আমেরিকায় অভিবাসী নাকৌলা ব্যাসেলেই নাকৌলা প্রযোজিত ট্রেইলারটা প্রথমে ইউটিউবে আপলোড করা হয় ২০১২ সালের জুলাই মাসে। সে সময় থেকে সেপটেম্বর প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত এটি কারোরই মনোযোগ আকর্ষণ করেনি। তারপর, সেপ্টেম্বারের ৮ তারিখ, মিশরের টেলিভিশন উপস্থাপক খালেদ আব্দুল্লাহ ফিল্মটার উপর রিপোর্ট করেন এবং ট্রেইলারটার আরবী সংস্করনের কিছু অংশ দেখান। তারপর কী হলো তা আমাদের সবার জানা।

Youtube-Censored

ইসলামের ভয়ে ভীত আর ইসলামী নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে পছন্দ করেন–এরকম উভয় পক্ষের ঘৃণাকে পুঁজি করে ইউটিউব ক্লিপ্টা ভাইরাসের মত ছড়িয়ে দেয়া হয় যা সারা বিশ্ব জুড়ে অপমানের স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করে। হাজার হাজার মুসলিম শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ক্রোধ প্রকাশ করেন এমন একটা ফিল্মের প্রতি যেটা তাদের নবী মোহাম্মদকে একটা ভাঁড় হিসেবে চিত্রায়ন করেছে। চিত্রায়ন করা হয়েছে বিবাহবহির্ভূত যৌন সম্পর্ক আর শিশুকামিতাকে অনুমোদনকারী হিসেবে। অপেক্ষাকৃত স্বল্পস্নখ্যক নির্বোধ, মৌলবাদী, আর মৌলবাদী মূর্খ সহিংসতা অবলম্বন করে, এবং ক্রোধান্বিত জনতা যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য পশ্চিমা দেশের কূটনৈতিক অবস্থানগুলোতে আক্রমণ করে। ফলাফলঃ প্রায় ৭৫ জন মানুষের মৃত্যু, অধিকাংশই আফগানিস্তান এবং পাকিস্তানে, এবং আহত হয়েছে শত শত লোক । বলা বাহুল্য, যে এই বর্বরতাকে কোনভাবেই সমর্থন করা যায় না।

বাংলাদেশে, আমরা দেখলাম দেশব্যাপী হরতাল সেই সাথে ঢাকা আর চট্টগ্রামে বড় বড় বিক্ষোভ। খেলাফত আন্দোলনের সদস্যরা, এক কুখ্যাত রাজনৈতিক দল যাদের লক্ষ্য দেশের ধর্মনিরপেক্ষ বিচার পদ্ধতিকে শরিয়া আইন দিয়ে পরিবর্তিত করা, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস অভিমুখে পদযাত্রার উদ্যোগ নেয়, কিন্তু পুলিশ তাদের থামিয়ে দেয়। যদিও ঢাকায় সহিংসতার কোন রিপোর্ট পাওয়া যায়নি, বিক্ষোভকারীরা একটা বাসে আগুন লাগায় এবং দক্ষিনপূর্ব বন্দর নগরীতে একটা পুলিশ ভ্যানের ক্ষতিসাধন করে।

শেখ হাসিনার সরকার মুভিটির প্রতি নিন্দাজ্ঞাপন করেন এবং ইউটিউবকে সেটা তাদের সার্ভার থেকে অপসারন করার জন্য আবেদন জানান। এরকম বেশ কয়েকটা অপসারনের আবেদনকে অগ্রাহ্য করে, গুগল বিবৃতি প্রকাশ করে এই বলে যে ক্লিপ্টা “স্পষ্টভাবে আমাদের নির্দেশিকার গন্ডির ভেতরে এবং সেহেতু ইউটিউবে থাকবে।” সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে, সরকার ইউটিউবে প্রবেশ অবরুদ্ধ করে দেয়, এবং তখন থেকে বাংলাদেশে ইউটিউব প্রবেশ অবরুদ্ধ হয়ে আছে। অধিকন্তু, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বি টি আর সি) দেশের জনগনের কাছে এই বলে আবেদন জানায় তারা যেন কোন ধরনের বিতর্কিত ধর্মীয় বিষয়বস্তু সোশাল মিডিয়াতে পোস্ট না করে, এবং ফেসবুককে আক্রমনাত্বক কার্টুন এবং কমেন্টসমূহকে সরিয়ে দেবার জন্য অনুরোধ করেন। ফেসবুক তাতে সম্মত হয়।

ইন্টারনেট ট্রাফিক র‌্যাংকিং সাইট এলেক্সা ইউটিউবকে বাংলাদেশের চতুর্থ জনপ্রিয়তম সাইট (গুগল, ফেসবুক ও ইয়াহুর পরে) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। সেহেতু এটা কোন অবাক করার বিষয় না যে বাংলাদেশের অসংখ্য ব্যবহারকারী এই নিষেধাজ্ঞার প্রতি প্রতিবাদ জানায়। যখন প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন বাংলাদেশীরা প্রক্সি এড্রেস এবং অন্যান্য টুল ব্যবহার করে সরকারী অবরোধকে পাশ কাটাচ্ছে, একজন মা এক অনলাইন মন্তব্যে অভিযোগ করলেন যে তার চার বছরের মেয়ে বর্ণমালা, নামতা এবং ছড়া শেখার জন্য যেসব ইউটিউব ক্লিপ ব্যবহার করতো তা আর দেখতে পারছে না। অন্যান্যরা অভিযোগ করেন ইউটিউব নিষেধাজ্ঞার জন্য অন্যান্য গুগলের সাইট, যেমন গুগল মেইল বা গুগ্ল নিউজ ব্যবহার করতে গিয়ে প্রযুক্তিগত অসুবিধায় পড়ছেন। তথাপি, কয়েকটি দেশীয় সংবাদ মাধ্যমের সাম্প্রতিক রিপোর্ট, তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভেতরের সূত্র ইঙ্গিত করছে যে এই ইউটিউব নিষেধাজ্ঞা অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত চলবে। তবে সম্প্রতি সরকার জানিয়েছে ডিসেম্বরের দিকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হতে পারে।

চিন্তা এবং বাক স্বাধীনতার অধিকারভোগী সেইসব সমাজের সাথে বাংলাদেশের যুক্ত হবার সময় কি হয়নি? পরিপক্ক একটা গণতান্ত্রিক দেশের লক্ষণ হলো সে দেশের সরকার জনগণের মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে রক্ষা করবে। বাংলাদেশের জনগণের অধিকার আছে তাদের নিজেদের মত করে সিদ্ধান্ত নেবার যে তারা কি বিতর্কিত ক্লিপ্টা দেখবে না কি সেটাকে প্রত্যাখ্যান করবে।

এখানে আমাদের মনে পরছে নোবেলজয়ী ভারতীয় প্রফেসর অমর্ত্য সেনের কথা। তাঁর প্রবন্ধ, “মানবাধিকার এবং এশীয় মূল্যবোধ,” কার্ণেগী কাউন্সিল অন এথিক্স এন্ড ইন্টারন্যাশনাল আফেয়ারস থেকে মূলত প্রকাশিত, তাতে তিনি স্পষ্টভাবে দেখিয়েছেন যে প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্যের মৌলিক মূল্যবোধের মধ্যে এমন কোন উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই যেটাকে সমুন্নীত এবং রক্ষা করতে হবে। এটা কোন আশ্চর্য্যের বিষয় নয়, কারন ভূগোলকের উভয় স্থানে যে জিনিসটা নিয়ে উদ্বেগ তা হলো মানুষের জন্য উপযুক্ত একটা আইনি কাঠামো। সেন দেখিয়েছেন প্রাচ্যের প্রধান চিন্তাবিদের কেউ কেউ, যেমন মুঘল বাদশা আকবর যিনি ১৫৫৬ থেকে ১৬০৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে শাসন করেছেন, শান্তি এবং সহনশীলতার সমর্থনে কথা বলেছেন এমন সব ধ্যান-ধারণা নিয়ে যা পশ্চিমা আলোকিত ব্যক্তিত্বদের, যেমন থমাস পেইন-এর, ধ্যান-ধারনা থেকে খুব বেশী আলাদা নয়।

স্থায়ীভাবে ইউটিউব নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়াশীল নীতি পরিস্কারভাবে বাংলাদেশের উন্নয়নের অগ্রগতিতে এক অনগ্রসর পদক্ষেপ হবে। যা পরিনামে এর অধিবাসীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াবে। আমরা আশা করছি সরকার এই নিষেধাজ্ঞাটি পূণর্বিবেচনা করবেন।

রেইনার এবার্ট: রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের ছাত্র, এবং বাংলাদেশ লিবেরাল ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

টিবর আর মাচান: চ্যাপম্যান ইউনিভার্সিটি ইন ক্যালিফোর্নিয়ার আরজিরস স্কুল অফ বিজনেস এন্ড ইকনমিক্সের আর সি হইলেস চেয়ার ইন ফ্রী এন্টারপ্রাইস এবং বিজনেস এথিক্সের অধিকারী। তিনি স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির হুভার ইন্সটিটিউশনের রিসার্চ ফেলো।

অনুবাদকঃ ইকবাল নাওয়েদ